কোন কোন অপ্রিয় ঘটনার মধ্যেও কিছু প্রিয় মুহূর্ত থেকে যায়। তেমনি একটা মুহূর্ত, বলা যায় অণুঘটনা আমার হাওর দর্শন।
প্রতিদিনকার নিয়ম মত সেইদিনও সকাল সকাল মুখে হাসি নিয়ে অফিসে পৌঁছে গেলাম। কিন্তু বিধাতার মনে হয় আমার হাসিমুখ খুব একটা পছন্দ হলনা, অফিসের বড় ভাইয়ের ডাক পড়ল কিছুক্ষনের মধ্যেই। “মনসুর, তোমাকে তো আজকে ঢাকার বাইরে যেতে হবে কিছুদিনের জন্য”, “কোথায় ভাইয়া?” “এইতো হবিগঞ্জের পৌরসভা আজমিরীগঞ্জ আর কিশোরগঞ্জের দুইটা পৌরসভায়”। মুখে হ্যাঁ মনে না নিয়ে নিজের সিটে এসে বসলাম। বড়ভাইয়ের উপরে রাগ না ঝাড়তে পেরে মেজাজটা আরও খারাপ হয়ে গেল।
যাই হোক, আজমিরীগঞ্জ সম্বন্ধে আমার আগে থেকে তেমন কিছুই জানা ছিলনা, সাধারন জ্ঞানের বই মারফত শুধু এইটুকুই জানা ছিল যে, এখানে সুরমা-কুশিয়ারা দুই ধারা একাকার হয়ে গিয়ে মেঘনায় বাকীজীবন সুখে-শান্তিতে কাটিয়ে দিয়েছে।
হঠাৎ মনে পড়ল আমার বন্ধুর বোনজামাই পোস্টিং হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে। মাত্র একদিন আগেই কাজের চাপের দোহাই দিয়ে দাদার নবীগঞ্জ যাওয়ার দাওয়াত ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। মনে হল বিধাতা মনে হয় সবাইকেই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে চায়, অহংকারটা শুধু তাঁরই সাজে।
সেই দাদার কাছে গিয়েই উঠলাম নবীগঞ্জে। অদ্ভুত ব্যাপার হল, নবীগঞ্জে যাকেই বলি আজমেরীর কথা, সেই একটা বাঁকা হাসি দেয়, যেন, এইবার বুঝবা বাছাধন কেমন লাগে যাইতে। কথায় কথায় জানতে পারলাম, আজমেরী হচ্ছে বান্দরবান-খাগড়াছড়ির মত পানিশমেন্ট পোস্টিং-এর জন্য কিছুটা বিখ্যাত। এইরকম ভয়াল দিনের প্রতীক্ষায় ঘুমিয়ে পড়লাম।
খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেই হবিগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করলাম। হবিগঞ্জ থেকে লঞ্চ ছাড়ে, আর মোটামুটি তিন ঘন্টার মধ্যেই আজমেরী পৌঁছে যাওয়া যাবে। তবে লঞ্চ দেখে বুঝলাম এর সাথে শ্যালো নৌকা কথাটা আরও মানানসই। প্রথম নৌকাটা এক্টুর জন্য মিস করায় পরেরটার জন্যে বিরক্তিকর এক ঘন্টার অপেক্ষা। তবে যাত্রীদের হাবভাবে বোঝা গেল এদের জীবন নিয়ে খুব একটা তাড়া নাই। নৌকা যখন ছাড়ল, সূর্য তার সমস্ত আক্রোশ নিয়ে আকাশে রাজত্ব করতে উঠছে। আমি খুব ভালোভাবেই আমার আগামী কয়েক ঘন্টার ভবিষ্যত আঁচ করতে পারছিলাম।
যথাসময়ের কিছু আগেই নৌকা ছেড়ে দেয়ায় একটু আশ্চর্য লাগল। মনে হল, ঢাকার বাংগালীদের সময় অজ্ঞানের ধারনাটা মনে হয় এখানে খাটেনা। নৌকার মাঝখানে অনেকখানি জায়গা, চাটাই বিছিয়ে সেখানে যাত্রীদের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তার সামনে একটা কাঠ, ছাউনি আর পাটাতনের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে, আমার মেরুদন্ডটাকে কাঠের সাথে সমান্তরালে রেখে আমি কাঠের সাথে হেলান দিয়ে বসলাম। যাত্রার প্রথমদিকে নৌকার দুইপাশে শুধু সৌন্দর্যের ছড়াছড়ি, লাল-শালুকের বাগান কেটে কেটে আমরা এগিয়ে যাচ্ছিলাম, আমার ভালো লাগার অনুভূতির শুরু এখান থেকেই।
কিছুক্ষন এভাবে চলার পর লাল-শালুকের বাগান পার হয়ে আমরা আস্তে আস্তে মূল হাওরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। মনে হল দুই পাশ থেকে দুই পাড় যেন নিজেদের মধ্যে অভিমান করে দুই পাশে সরে যাচ্ছে, আর মাঝখানে রেখে যাচ্ছে অকূল পারাবার। এই সৌন্দর্যের পারাবারে চোখ মেলে দেখার মত অনেক কিছু পেলাম। ছোট ছোট পাখিগুলো টুপ করে ডুব দিয়ে আবার উড়াল দিয়ে চোখের আড়াল হয়ে যায়। আবার কোন কোন ঝোপ হয়ে উঠেছে পাখিদের সমাবেশের আদর্শ জায়গা। এর মাঝেই আমাদের ভটভটি তার একঘেয়ে ভটভট শব্দ করে হাওরের নিস্তরঙ্গ জলরাশিতে তুলছে অকারন ঢেউ। হয়তো পানির নিচে মাছেরা তাদের কাচ্চা-বাচ্চা নিয়ে সরে যায় নিরাপদ দূরত্বে আর তাদের শোনায় দৈত্য-দানোর গল্প, আগের দিনে যারা আসত ছপছপিয়ে, আর এখন বিকট শব্দে।
কিছুক্ষন এভাবে চলার পর পাড়ের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেল। যেদিকে দেখা যায় সেদিকেই পানি, শুধু দূরে দিগন্তের ক্যানভাসে সবুজ আর কালো রঙের দন্দ্ব আর মিলনের খেলা। প্রায় পৌনে একঘন্টা চলার পর একটা দ্বীপের মত গ্রাম। মনে হল তারা এই জলচর যন্ত্রের অপেক্ষাতেই ছিল। পাড়ের ধারেই ঘরবাড়ি থেকে বেরিয়ে আসল নিঃসঙ্গ এই গ্রামের কিছু মানুষ, তাদের চোখেমুখে এর কোন ছাপই চোখে পড়লনা অথচ শহুরে মানুষগুলো এত মানুষের মাঝে থেকেও কতটা নিঃসঙ্গ।
ছোট দ্বীপটা পার হয়ে পড়লাম সত্যিকারের হাওরে। হাওর নামটা এসেছে সাগর থেকে। সাগর থেকে সায়র, তার থেকে হাওর। নামের ব্যুৎপত্তিগত যথার্থতা এখানেই ঠাহর করতে পারলাম। চারিদিকে ধূধূ জলাভূমি, কোথাও কূলের কোন চিহ্ণ মাত্র নেই। এরকম জায়গাতেই মনে হয় ময়মনসিংহ গীতিকার নায়করা ঝড়ের রাতে পথ হারিয়ে নিজের প্রেমিকার উদ্দেশ্যে রচনা করে গেছে বিরহের সব অমর কাব্য। মাঝে জেগে থাকা গাছগুলো বোবা প্রহরীর মত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করে যাচ্ছে মহাকালের আসা যাওয়া। একটা গাছের কংকালের উপর দেখা গেল এক বাজপাখি। একাকী রাজার মত শিকারী চোখ নিয়ে অপেক্ষা করছে তার শিকারের।